Monday, 25 December 2017

ঘুষ খাওয়া নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে তোলপাড়

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদে
আপনারা ঘুষ খান, কিন্তু সহনীয় মাত্রায় খান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের এ বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় চলছে দেশজুড়ে। তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি চলছে নানা ধরনের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ। মন্ত্রীর এ বক্তব্যে ঘুষ দুর্নীতি আরো ছড়িয়ে পড়বে বলে উদ্বেগ আর হতাশা প্রকাশা করেছেন অনেকে। কেউ কেউ মন্ত্রীর বক্তব্যকে জাতির জন্য ভয়ঙ্কর বার্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জাতির মেরুদণ্ড নির্মাণের দায়িত্ব নিয়োজিত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্যকে গভীর দুঃখজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রবীণ অনেক শিক্ষাবিদ।
ঘুষ খাওয়া নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পরপরই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিতে থাকেন অনেকে। তাতে তারা ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করার পাশাপাশি ব্যঙ্গ বিদ্রুপসহকারে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন গতকাল দিনব্যাপী। অফিস, চায়ের আডডায়ও চলে এ নিয়ে তির্যক আলোচনা। তাদের মতে মন্ত্রীর এ বক্তব্যে ঘুষখোররা যেমন উৎসাহিত হবে- তেমনি বাড়বে এর মাত্রা। শিক্ষামন্ত্রী ঘুষকে বৈধতা দিলেন মন্তব্য করে অনেকে ফেসবুকে লিখেছেন ঘুষের সহনীয় মাত্রা কতটুকু তা বললে ভালো হতো। অনেকে লিখেছেন এখন আর দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের প্রয়োজন নেই। মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর দুদক বিলুপ্ত করা উচিত। আরেকজন প্রশ্ন করেছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে। তার পরও সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন মন্ত্রীর পক্ষ থেকে এভাবে সরকারি লোকজনকে ঘুষ খাওয়াকে বৈধতা দান এবং উৎসাহ দেয়া হয় তাহলে আমরা আর কষ্ট করে ট্যাক্স দেবো কেন। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় তাদের উচ্চ বেতন দেয়ার পরও যদি তাদের ঘুষ খাওয়া অব্যাহত থাকে তাহলে তাদের বেতন বাড়ানো হলো কেন। এমনকি বেতন বাড়ানোর পর ঘুষ কি পরিমাণ কমেছে সে প্রশ্নও উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এমিরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্য অপ্রত্যাশিত, দুঃখজনক। এতে দুর্নীতিবাজরা আরো উৎসাহিত হবে। মন্ত্রীর দায়িত্ব অনিয়ম প্রতিকার করা। কিন্তু তিনি তার এ বক্তব্যের মাধ্যমে দুর্নীতি মেনে নিলেন। এমনিতেই শিক্ষা খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা অভিযোগ রয়েছে, তারপর মন্ত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসা উচিত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্য কোনো অবস্থাতেই সমর্থন করা যায় না।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যের মাধ্যমে জাতির কাছে এক ভয়ঙ্কর বার্তা পাঠিয়েছেন। জাতির মেরুদণ্ড গঠনের দায়িত্বে বসে তিনি এ ধরনের কথা বলতে পারে না।
কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে প্রশ্নফাঁসসহ নানা কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত দেশের শিক্ষা খাত। শিক্ষার মানের ধস বারবার জাতীয় আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সমাপনী পরীক্ষা, জেএসসি পরীক্ষা থেকে শুরু করে প্রায় সব পাবলিক পরীক্ষায় ছড়িয়ে পড়েছে অরাজকতা। প্রশ্নফাঁস এতই মহামারী আকার ধারণ করেছে যে, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায়ও প্রশ্নফাঁসের কারণে শত শত স্কুলে পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়া এবং ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার প্রশ্নের হুবহু মিল থাকার পরও শুরুতে প্রশ্নফাঁস অস্বীকার করেছেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি।
পরে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা স্বীকার করার পর সর্বশেষ শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ শিক্ষকদেরই আসল প্রশ্নফাঁসকারী হিসেবে বক্তব্য দেন। এ নিয়ে শিক্ষকদের পক্ষে শুরু হয় উত্তপ্ত সমালোচনা। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বারবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের গণহারে অকৃতকার্য হওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনায় সমালোচনা চলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার মান নিয়ে। পাঠ্যবই পরিবর্তন নিয়েও কয়েক বছর ধরে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে বিভিন্ন মহলে। সমাপনী পরীক্ষা, জেএসসি পরীক্ষা ঘিরে শিক্ষার্থী, অভিভাবকেরা বন্দী হয়ে পড়েছেন কোচিং প্রাইভেট ব্যবস্থার কাছে। কোচিং প্রাইভেট নির্ভরতা কমার আশা নিয়ে চালু করা হয়েছিল সৃজনশীল ব্যবস্থা। কিন্তু আজ অবধি বেশির ভাগ শিক্ষকই এটি রপ্ত করতে পারেননি। ঘন ঘন পাবলিক পরীক্ষা, সৃজনশীল, প্রশ্নফাঁসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকসহ সব মহলে দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা। এসব কারণে বারবার সমালোচিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
গত রোববার শিক্ষাভবনে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) সম্মেলন কক্ষে অধিদফতেরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ল্যাপটপ ও প্রশিক্ষণ সনদ বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খান, কিন্তু সহনীয় হয়ে খান। কেননা, আমার এটা বলার সাহসই নেই যে, ঘুষ খাবেন না। তা অর্থহীন হবে।’
প্রায় সবখানেই ঘুষ লেনদেন হচ্ছে দাবি করে মন্ত্রী বলেন, ‘খালি যে অফিসাররা চোর, তা না। মন্ত্রীরাও চোর। আমিও চোর। এ জগতে এমনই চলে আসছে। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।’

২০১৮ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সময় সূচি


বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ২০১৮ সালের সূচী.. 
১- ১৫ জানুয়ারি থেকে ত্রিদেশীয় সিরিজ।  প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে আর শ্রীলংকা।  

২- জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি,শ্রীলংকার সাথে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ।  সিরিজ হবে দুইটি টেস্ট এবং দুইটি টি-টুয়েন্টির।  কোনো ওয়ানডে ম্যাচ নেই।  

৩- মার্চ ২০১৮, শ্রীলংকার ৭০ তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে 'নিদাহাস কাপ' হবে বাংলাদেশ,শ্রীলংকা এবং ভারতের মধ্যে।  এটা টি-টুয়েন্টি কাপ।  

৪- জুলাই ২০১৮.. ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাবে বাংলাদেশ। সিরিজে আছে,দুইটি টেস্ট,তিনটি ওডিয়াই এবং একটি টি টুয়েন্টি।  
৫- আগস্ট ১৮, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কঠিন সিরিজ।  অস্ট্রেলিয়ার সাথে এই সিরিজ।  দুইটি টেস্ট এবং তিনটি ওয়ানডে থাকবে।  

৭- সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হবে ভারতে।  সেপ্টেম্বরের ১৫-৩০ তারিখ পর্যন্ত চলবে এশিয়া কাপ।  এবার সবার সাথে কোয়ালিফাই করবে আফগানিস্তান।  অন্য দলকে কোয়ালিফাইয়ার খেলে আসতে হবে।  হয়তো পাকিস্তান এশিয়া কাপ বর্জন করবে।  

৮- অক্টোবর-নভেম্বর ১৮- ফিরতি সিরিজে বাংলাদেশ আসবে উইন্ডিজ বাহিনী।  দুইটি টেস্ট,তিনটি ওয়ানডে এবং একটি টি টুয়েন্টি থাকবে।  

৯- নভেম্বর-ডিসেম্বর বিপিএলের ষষ্ঠ আসর।  

বিঃদ্রঃ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কোনো ম্যাচ নেই এফটিপির সূচী অনুযায়ী।  হয়তো সেসময় দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতেও পারে বাংলাদেশ দল।   

Friday, 22 December 2017

জাতিসংঘে প্রস্তাব পাসে খুশিতে মাতোয়ারা মুসলিম বিশ্ব

জেরুজালেম ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মুসলিম বিশ্ব খুশিতে মাতোয়ারা। ফিলিস্তিনিদের পক্ষাবলম্বনকারী দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মুসলিম বিশ্বের নেতারা। রাশিয়া বলেছে, এটা আমেরিকার জন্য বড় পরাজয়। তবে ক্ষোভে উন্মত্ত মার্কিন প্রশাসন এখন কী পদক্ষেপ নেয় তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে।
 
বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্পের প্রস্তাব বাতিল চেয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবের পক্ষে ১২৮টি দেশ ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় মাত্র ৯টি দেশ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ছাড়া বাকি দেশগুলো কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ। ভোটদান থেকে বিরত ছিল ৩৫ দেশ। এ প্রস্তাবের আইনি মূল্য কম হলেও প্রতীকী মূল্য ব্যাপক বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
 
ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ওআইসির চেয়ারম্যান এবং তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। টুইটারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিপুল সমর্থনকে ভীষণ আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, ট্রাম্প প্রশাসন ওই দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করবে। এটা স্পষ্ট যে, এর কোনো বৈধতা নেই।’ ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, আমেরিকার মধ্যস্থতা তার দেশ আর মানবে না।
 
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জেরুজালেম নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে বেশিরভাগ দেশ। সাহায্য বন্ধে মার্কিন হুমকির তোয়াক্কা না করে এসব দেশ ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন কী ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সেটা নিয়ে চলছে আলোচনা। ট্রাম্পপন্থী বহু রাজনীতিবিদ ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সহযোগিতা গ্রহণকারী দেশগুলো শাসানো উচিত। তাদের বলা উচিত, এমনটা যেন আর না হয়। কেউ কেউ বলছেন, মার্কিন কর্মকর্তারা যেন বিপক্ষে ভোট দেয়া দেশের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেন। তবে কঠিন পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে সংশয়ও রয়েছে তাদের মনে।
 
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি দু’জনই আর্থিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। সহযোগিতা বন্ধের হুমকি দিয়ে ভোটের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তাদের আমরা কোটি কোটি ডলার সহায়তা করি। আর তারা আমাদেরই বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চায়। ভোট দিক তারা, আমাদের অনেক টাকা বাঁচবে।’
 
ভোটের আগ মুহূর্তে দেয়া ভাষণে নিকি হ্যালি বলেন, জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন সংস্থায় সবচেয়ে বেশি অর্থ দেয় আমেরিকা। ফলে এ সংস্থায় তাদের চাহিদা বা প্রত্যাশাও বেশি থাকবে। অথচ তার বদলে এখানে যুক্তরাষ্ট্রকে অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। নিকি হ্যালি বলেন, ‘আমাদের বিনিয়োগের জন্য আরও বেশি চাওয়ার অধিকার রয়েছে। যদি আমাদের বিনিয়োগ ব্যর্থ হয় তাহলে আরও লাভজনক খাতে আমাদের বিনিয়োগ কাজে লাগানোর বাধ্যকতা আছে। যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেবে তাদের বিষয়টি মনে রাখা উচিত।’ সাধারণ পরিষদের জরুরি বৈঠকে নিকি হ্যালি অঙ্গীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমেই দূতাবাস নিয়ে যাবে। এটাই চায় আমেরিকার মানুষ এবং এটা করা সঠিক। মার্কিন দূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে শান্তি প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্র আজকের এ দিনটি মনে রাখবে। যেদিন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের শিকার হয়েছে। আমরা তখনও এ দিনটি মনে রাখব যখন অনেকে আমাদের কাছে সহযোগিতা চাইতে আসবে, যা তারা প্রায় সময়েই করে থাকে।
 
হ্যালি ঘোষণা দিয়েছিলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ভোট দেবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয় যুক্তরাষ্ট্র কেমন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এক মার্কিন সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, ভোটের জন্য দেশগুলোকে ছাড় দেয়া হবে না। বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র হেদার নরেট বলেছেন, এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
 
মার্কিন রাজনীতিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, মিসর ও জর্ডানের মতো মিত্ররাও যেখানে রয়েছে সেখানে কিভাবে এ পদক্ষেপ নেবে যুক্তরাষ্ট্র। রিগান ও বুশ প্রশাসনে শীর্ষ কমকর্তা হিসেবে দায়িত্বপালন করা এলিয়ট আব্রাম বলেন, ওই দেশগুলোতে আর্থিক সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রেরই জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখে।
 
ট্রাম্পের পক্ষে যে কারণে ভোট : জেরুজালেমকে ইসরাইলি দখলদারিত্বের পক্ষে ভোট দেয় ৯টি দেশ। এ ৯ দেশের দুটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। অর্থাৎ মাত্র সাতটি দেশ এ ইস্যুতে ট্রাম্পের পাশে ছিল। ওই সাতটি দেশের মধ্যে চারটিই আবার ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র। চার দেশের তিনটিই এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ ছিল। এখনও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে তারা কার্যত মার্কিন শাসনাধীন। দেশ তিনটি হচ্ছে- মাইক্রোনেশিয়া, পালাউ এবং দ্য মার্শাল আইল্যান্ডস। এর মধ্যে ১০ হাজারের কম জনসংখ্যার দেশও আছ। কোনোটির মানুষ আবার চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতেও চাকরি করতে পারেন। ফলে পররাষ্ট্র নীতিতে মার্কিন সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ তাদের নেই বললেই চলে। বাকি দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া হুমকির প্রভাব ছিল।
 
ট্রাম্পের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়া এবং ভোটদান থেকে বিরত থাকা দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ভীতি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে এ দেশগুলোর নাম-পরিচয়ের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে জেরুজালেম প্রশ্নে মার্কিন পদক্ষেপকে সমর্থন জানায় গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, পালাই, দ্য মার্শাল আইল্যান্ডস, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরু, টোগো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে বাদ দিলে বাকি সাতটি দেশের মধ্যে চারটি দেশই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র।
 
মার্শাল আইল্যান্ডস প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ জারি হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এ দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে ৫৩ হাজার মানুষের বসবাস। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বাধীনতা পায় মার্শাল আইল্যান্ডস। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির করা এক চুক্তিতে ওয়াশিংটনকে মার্শাল আইল্যান্ডসের পররাষ্ট্র নীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা দেয়া আছে। পালাউ রাষ্ট্রটিও প্রশান্ত মহাসাগরের একগুচ্ছ দ্বীপ নিয়ে গঠিত যা যুক্তরাষ্ট্রের শাসনাধীন ছিল। ১৯৯৪ সালে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করে। তবে এক চুক্তির আওতায় ৫০ বছর ধরে দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুকের তথ্য অনুযায়ী, পালাউয়ে ২১ হাজার ৪০০ মানুষের বসবাস। আরেক দ্বীপ রাষ্ট্র মাইক্রোনেশিয়ায় ১ লাখ ৪ হাজার মানুষ বাস করেন। ১৯৮৬ সাল নাউরু যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে না থাকলেও ২১ বর্গ কিলোমিটারের এ দেশটিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ১০ হাজারেরও কম।
 
কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোসহ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলো ভোটদান থেকে বিরত ছিল। আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকো এর আগে ফিলিস্তিনের সমর্থনে থাকলেও বৃহস্পতিবার ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসের অবস্থানও একই রকম ছিল। কেনিয়ার মতো উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের মতো আফ্রিকান দেশগুলোও ভোটদান থেকে বিরত ছিল। মিয়ানমার ও ফিলিপাইনও বিরত ছিল ভোটদান থেকে। ২০১২ সালে তারা ফিলিস্তিনের পক্ষেই ছিল। তবে এশিয়ায় ভারত ও চীন ইসরাইলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিগত কয়েক বছরে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছে।
 
আমেরিকার জন্য বড় পরাজয় -রাশিয়া : রাশিয়ার পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি আলেক্সি পুশকোভ বলেছেন, মার্কিন হুমকি সত্ত্বেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জেরুজালেম ইস্যুতে প্রস্তাব পাস হয়েছে। এটা আমেরিকার জন্য বড় পরাজয়।
 
তিনি শুক্রবার তার টুইটার পেজে লিখেছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বায়তুল মোকাদ্দাস ও নাৎসিবাদ সংক্রান্ত দুটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। দুটি প্রস্তাবেরই বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল আমেরিকা। কিন্তু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্য দেশের ভোটে দুটি প্রস্তাবই পাস হয়েছে। আমেরিকা যে বিশ্বে একঘরে হয়েছে এটি তার প্রমাণ। তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আমেরিকা পরাজিত হয়েছে।
 
আমেরিকাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মানব না -মাহমুদ আব্বাস : ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, তার দেশ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় আমেরিকার পক্ষ থেকে নেয়া কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করবে না। একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনকে একটি ‘অসৎ মধ্যস্থতাকারী’ পক্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
 
শুক্রবার প্যারিসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের পর মাহমুদ আব্বাস বলেন, শান্তি প্রক্রিয়ায় আমেরিকা নিজেকে ‘অসৎ মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রমাণ করেছে এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত কোনো পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করব না।”
 
প্রেসিডেন্ট ম্যাত্রেঁদ্ধা বলেন, মার্কিনিরা নিজেদের একঘরে করে ফেলছে। তবে এ একই কাজ আমি না করার চেষ্টা করছি।”
 
সত্য ও ন্যায়ের জয় হয়েছে -হামাস : জাতিসংঘের জরুরি বৈঠকে জেরুজালেম প্রশ্নে ভোটাভুটিতে সত্য, ন্যায় ও ইতিহাসের জয় হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাস। বৃহস্পতিবার ভোটের পর হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়েহ এ মন্তব্য করেছেন। হামাস প্রধান জানান, জাতিসংঘের এ ভোটে জনগণের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক ভীতি প্রদর্শন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে হানিয়েহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে আন্তর্জাতিক ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জেরুজালেমকে রাজধানীর স্বীকৃতি প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

Source file : http://bdexpress.uodoo.com

Spiritual Music || Relaxation Music || মাজারের সামনের দৃশ্য - গান

Saturday, 9 December 2017

সোফিয়ার বাংলাদেশ সফরে কত লাখ টাকা খরচ হলো!



এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রধান আকর্ষণ ছিল সিঙ্গাপুরে তৈরি ও সৌদি আরবের নাগরিকত্ব পাওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট সোফিয়া। মঙ্গলবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছায় সোফিয়া এবং এর নির্মাতা ডেভিড হ্যানসন।
এদিন বেলা আড়াইটায় ‘টেক টক উইথ সোফিয়া’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বুধবার ভোর রাতে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ে সোফিয়া। ২৪ ঘণ্টারও কম সময় ঢাকায় অবস্থান করে এ রোবট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় শীর্ষে পৌঁছে যায়।
সবারই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল রোবট সোফিয়ার নানা দিক। তবে সোফিয়াকে বাংলাদেশে আনতে কত টাকা খরচ হয়েছে তা নিয়ে শুরু হয় নানা বিভ্রান্তি। ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা খরচ করে সোফিয়াকে আনা হয়েছে দাবি করে অনেকে ফেসবুকে সমালোচনাও করেন।
এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে যারা বাধাগ্রস্ত করতে চায়, তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানারকম প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। সেসব গুজবে কান না দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের গড়ার পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সোফিয়াকে বাংলাদেশের আনার পুরো খরচ বহন করেছে স্পন্সর প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।’
এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্ত খান বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক সব সময় বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এরই অংশ হিসেবে রোবট সোফিয়াকে বাংলাদেশে প্রদর্শনের জন্য স্পন্সর করেছে ইসলামী ব্যাংক। এ রোবটকে দেখতে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এসেছিল। তারা উৎসাহ পেয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ও বিজ্ঞান বিষয়ে অনেক ধারণা নিয়েছে এটাই আমাদের স্বার্থকতা।’
রোবট সোফিয়াকে বাংলাদেশে আনতে কত টাকা খরচ হয়েছে জানতে চাইলে আরাস্ত খান বলেন, ‘আপনি কত ধারণা করছেন? খুবই অল্প খরচে এটি আনা হয়েছে। যা আপনাদের ধারণায় নেই।’
সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থের পরিমাণ না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রোবট সোফিয়ার পেছনে এক কোটিরও কম টাকা খরচ হয়েছে।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ‘রোবট সোফিয়াকে বাংলাদেশে আনার পেছনে প্রায় ৯০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।’ সূত্র- জাগো নিউজ

অর্ধ পৃথিবীর শাসক ওমর (রা) যে চিঠি পাঠ করে এত কেঁদেছেন যে, তাঁর চোখের পানিতে দাঁড়ি ভিজে গেল


চিঠি পাঠ করে হযরত উমর রা. এত কেঁদেছেন যে তাঁর চোখের পানিতে দাঁড়ি ভিজে গেল।
হযরত উমর (রাঃ) এর খিলাফতের প্রথম দিকে হযরত আবু উবাইদা বায়তুল মাল দেখাশুনা করতেন। ঈদের আগের দিন খলীফার স্ত্রী বললেন, ‘আমাদের জন্য ঈদের নতুন কাপড় না হলেও চলবে, কিন্তু ছোট বাচ্চাটি ঈদের নতুন কাপড়ের জন্য কাঁদছে’।
খলীফা বললেন, ‘আমার নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই’। খলীফা পত্নী উম্মে কুলসুম খলীফার আগামী মাসের বেতন থেকে অগ্রিম নেয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করলেন।
খলীফা উমর (রাঃ) হযরত আবু উবাইদাকে খলীফার এক মাসের অগ্রিম বেতন দেয়ার জন্য চিঠি পাঠালেন।
সমগ্র মুসলিম জাহানের খলীফা যিনি, যিনি অর্ধ পৃথিবী শাসন করছেন, তাঁর এ ধরণের চিঠি পাঠ করে হযরত আবু উবাইদার চোখে পানি এসে গেল। উম্মতে আমীন হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) বাহককে টাকা না দিয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ে চিঠি লিখলেন, ‘আমীরুল মুমিনীন! অগ্রিম বেতন বরাদ্দের জন্য দুটি বিষয়ে আপনাকে ফয়সালা দিতে হবে। প্রথমত আগামী মাস পর্যন্ত আপনি বেঁচে থাকবেন কি না?
দ্বিতীয়ত, বেঁচে থাকলেও মুসলমানেরা আপনাকে খিলাফতের দায়িত্বে বহাল রাখবে কিনা?’
চিঠি পাঠ করে হযরত উমর এত কেঁদেছেন যে তাঁর চোখের পানিতে দাঁড়ি ভিজে গেলো। আর হাত তুলে হযরত আবু উবাইদার জন্য দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ আবু উবাইদার উপর রহম কর, তাঁকে হায়াত দাও’।
স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জাতির একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি আছেন, আমার উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হচ্ছেন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ’।

Monday, 4 December 2017

ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো


স্টিভ জবস বিশ্বখ্যাত কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপল ও অ্যানিমেশন স্টুডিও পিক্সারের (টয় স্টোরি, ফাইন্ডিং নিমো, মনস্টার ইনকরপোরেটেড, ওয়াল-ই, আপ-এর মতো অসাধারণ অ্যানিমেশন তৈরি করেছেন) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ২০০৫ সালে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন স্টিভ জবস। সে বছর ১২ জুন এক ঝাঁক তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর সেই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যে ভাষণটি তিনি দিয়েছিলেন, সেটি সত্যিই অসাধারণ। 

প্রথমেই একটা সত্য কথা বলে নিই। আমি কখনোই বিশ্ববিদ্যালয় পাস করিনি। তাই সমাবর্তন জিনিসটাতেও আমার কখনো কোনো দিন উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এর চেয়ে বড় সত্য কথা হলো, আজকেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে কাছে থেকে দেখছি আমি। তাই বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। কোনো কথার ফুলঝুরি নয় আজ, স্রেফ তিনটা গল্প বলব আমি তোমাদের। এর বাইরে কিছু নয়।
আমার প্রথম গল্পটি কিছু বিচ্ছিন্ন বিন্দুকে এক সুতায় বেঁধে ফেলার গল্প।
ভর্তি হওয়ার ছয় মাসের মাথাতেই রিড কলেজে পড়ালেখায় ক্ষ্যান্ত দিই আমি। যদিও এর পরও সেখানে আমি প্রায় দেড় বছর ছিলাম, কিন্তু সেটাকে পড়ালেখা নিয়ে থাকা বলে না। আচ্ছা, কেন আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লাম?
এর শুরু আসলে আমার জন্মেরও আগে। আমার আসল মা ছিলেন একজন অবিবাহিত তরুণী। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। আমার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আমাকে এমন কারও কাছে দত্তক দেবেন, যাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে। সিদ্ধান্ত হলো এক আইনজীবী ও তাঁর স্ত্রী আমাকে দত্তক নেবেন। কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে দেখা গেল, ওই দম্পতির কারোরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই, বিশেষ করে আইনজীবী ভদ্রলোক কখনো হাইস্কুলের গণ্ডিই পেরোতে পারেননি। আমার মা তো আর কাগজপত্রে সই করতে রাজি হন না। অনেক ঘটনার পর ওই দম্পতি প্রতিজ্ঞা করলেন, তাঁরা আমাকে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন, তখন মায়ের মন একটু গলল। তিনি কাগজে সই করে আমাকে তাঁদের হাতে তুলে দিলেন।
এর ১৭ বছর পরের ঘটনা। তাঁরা আমাকে সত্যি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু আমি বোকার মতো বেছে নিয়েছিলাম এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়, যার পড়ালেখার খরচ প্রায় তোমাদের এই স্ট্যানফোর্ডের সমান। আমার দরিদ্র মা-বাবার সব জমানো টাকা আমার পড়ালেখার পেছনে চলে যাচ্ছিল। ছয় মাসের মাথাতেই আমি বুঝলাম, এর কোনো মানে হয় না। জীবনে কী করতে চাই, সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা এ ব্যাপারে কীভাবে সাহায্য করবে, সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। অথচ মা-বাবার সারা জীবনের জমানো সব টাকা এই অর্থহীন পড়ালেখার পেছনে আমি ব্যয় করছিলাম। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং মনে হলো যে এবার সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সিদ্ধান্তটা ভয়াবহ মনে হলেও এখন আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়, এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ডিগ্রির জন্য দরকারি কিন্তু আমার অপছন্দের কোর্সগুলো নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারলাম, কোনো বাধ্যবাধকতা থাকল না, আমি আমার আগ্রহের বিষয়গুলো খুঁজে নিতে লাগলাম।
পুরো ব্যাপারটিকে কোনোভাবেই রোমান্টিক বলা যাবে না। আমার কোনো রুম ছিল না, বন্ধুদের রুমের ফ্লোরে ঘুমোতাম। ব্যবহূত কোকের বোতল ফেরত দিয়ে আমি পাঁচ সেন্ট করে কামাই করতাম, যেটা দিয়ে খাবার কিনতাম। প্রতি রোববার রাতে আমি সাত মাইল হেঁটে হরেকৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধু একবেলা ভালো খাবার খাওয়ার জন্য। এটা আমার খুবই ভালো লাগত। এই ভালো লাগাটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
রিড কলেজে সম্ভবত দেশে সেরা ক্যালিগ্রাফি শেখানো হতো সে সময়। ক্যাম্পাসে সাঁটা পোস্টারসহ সবকিছুই করা হতো চমত্কার হাতের লেখা দিয়ে। আমি যেহেতু আর স্বাভাবিক পড়ালেখার মাঝে ছিলাম না, তাই যে কোনো কোর্সই চাইলে নিতে পারতাম। আমি ক্যালিগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। সেরিফ ও স্যান সেরিফের বিভিন্ন অক্ষরের মধ্যে স্পেস কমানো-বাড়ানো শিখলাম, ভালো টাইপোগ্রাফি কীভাবে করতে হয়, সেটা শিখলাম। ব্যাপারটা ছিল সত্যিই দারুণ সুন্দর, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরের একটা আর্ট। আমি এর মধ্যে মজা খুঁজে পেলাম।
এ ক্যালিগ্রাফি জিনিসটা কোনো দিন বাস্তবজীবনে আমার কাজে আসবে—এটা কখনো ভাবিনি। কিন্তু ১০ বছর পর আমরা যখন আমাদের প্রথম ম্যাকিন্টোস কম্পিউটার ডিজাইন করি, তখন এর পুরো ব্যাপারটাই আমার কাজে লাগল। ওটাই ছিল প্রথম কম্পিউটার, যেটায় চমত্কার টাইপোগ্রাফির ব্যবহার ছিল। আমি যদি সেই ক্যালিগ্রাফি কোর্সটা না নিতাম, তাহলে ম্যাক কম্পিউটারে কখনো নানা রকম অক্ষর (টাইপফেইস) এবং আনুপাতিক দূরত্বের অক্ষর থাকত না। আর যেহেতু উইন্ডোজ ম্যাকের এই ফন্ট সরাসরি নকল করেছে, তাই বলা যায়, কোনো কম্পিউটারেই এ ধরনের ফন্ট থাকত না। আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়তাম, তাহলে আমি কখনোই ওই ক্যালিগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হতাম না এবং কম্পিউটারে হয়তো কখনো এত সুন্দর ফন্ট থাকত না। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে এক সুতায় বাঁধা অসম্ভব ছিল, কিন্তু ১০ বছর পর পেছনে তাকালে এটা ছিল খুবই পরিষ্কার একটা বিষয়।
আবার তুমি কখনোই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে এক সুতায় বাঁধতে পারবে না। এটা কেবল পেছনে তাকিয়েই সম্ভব। অতএব, তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে, বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একসময় ভবিষ্যতে গিয়ে একটা অর্থবহ জিনিসে পরিণত হবেই। তোমার ভাগ্য, জীবন, কর্ম, কিছু না কিছু একটার ওপর তোমাকে বিশ্বাস রাখতেই হবে। এটা কখনোই আমাকে ব্যর্থ করেনি, বরং উল্টোটা করেছে।
আমার দ্বিতীয় গল্পটি ভালোবাসা আর হারানোর গল্প।
আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম। কারণ, জীবনের শুরুতেই আমি যা করতে ভালোবাসি, তা খুঁজে পেয়েছিলাম। আমার বয়স যখন ২০, তখন আমি আর ওজ দুজনে মিলে আমাদের বাড়ির গ্যারেজে অ্যাপল কোম্পানি শুরু করেছিলাম। আমরা পরিশ্রম করেছিলাম ফাটাফাটি, তাই তো দুজনের সেই কোম্পানি ১০ বছরের মাথায় চার হাজার কর্মচারীর দুই বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়। আমার বয়স যখন ৩০, তখন আমরা আমাদের সেরা কম্পিউটার ম্যাকিন্টোস বাজারে ছেড়েছি। এর ঠিক এক বছর পরের ঘটনা। আমি অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুত হই। যে কোম্পানির মালিক তুমি নিজে, সেই কোম্পানি থেকে কীভাবে তোমার চাকরি চলে যায়? মজার হলেও আমার ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছিল। প্রতিষ্ঠান হিসেবে অ্যাপল যখন বড় হতে লাগল, তখন কোম্পানিটি ভালোভাবে চালানোর জন্য এমন একজনকে নিয়োগ দিলাম, যে আমার সঙ্গে কাজ করবে। এক বছর ঠিকঠাকমতো কাটলেও এর পর থেকে তার সঙ্গে আমার মতের অমিল হতে শুরু করল। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ তার পক্ষ নিলে আমি অ্যাপল থেকে বহিষ্কৃত হলাম। এবং সেটা ছিল খুব ঢাকঢোল পিটিয়েই। তোমরা বুঝতেই পারছ, ঘটনাটা আমার জন্য কেমন হতাশার ছিল। আমি সারা জীবন যে জিনিসটার পেছনে খেটেছি, সেটাই আর আমার রইল না।
সত্যিই এর পরের কয়েক মাস আমি দিশেহারা অবস্থায় ছিলাম। আমি ডেভিড প্যাকার্ড ও বব নয়েসের সঙ্গে দেখা করে পুরো ব্যাপারটার জন্য ক্ষমা চাইলাম। আমাকে তখন সবাই চিনত, তাই এই চাপ আমি আর নিতে পারছিলাম না। মনে হতো, ভ্যালি ছেড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু সেই সঙ্গে আরেকটা জিনিস আমি বুঝতে পারলাম, আমি যা করছিলাম, সেটাই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। চাকরিচ্যুতির কারণে কাজের প্রতি আমার ভালোবাসা এক বিন্দুও কমেনি। তাই আমি আবার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
প্রথমে মনে না হলেও পরে আবিষ্কার করলাম, অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুতিটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা। আমি অনেকটা নির্ভার হয়ে গেলাম, কোনো চাপ নেই, সফল হওয়ার জন্য বাড়াবাড়ি রকমের কৌশল নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। আমি প্রবেশ করলাম আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল অংশে।
পরবর্তী পাঁচ বছরে নেক্সট ও পিক্সার নামের দুটো কোম্পানি শুরু করি আমি, আর প্রেমে পড়ি এক অসাধারণ মেয়ের, যাকে পরে বিয়ে করি। পিক্সার থেকে আমরা পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার অ্যানিমেশন ছবি টয় স্টোরি তৈরি করি, আর এখন তো পিক্সারকে সবাই চেনে। পৃথিবীর সবচেয়ে সফল অ্যানিমেশন স্টুডিও। এরপর ঘটে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। অ্যাপল নেক্সটকে কিনে নেয় এবং আমি অ্যাপলে ফিরে আসি। আর লরেনের সঙ্গে চলতে থাকে আমার চমত্কার সংসার জীবন।
আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এগুলোর কিছুই ঘটত না, যদি না অ্যাপল থেকে আমি চাকরিচ্যুত হতাম। এটা ছিল খুব বাজে, তেতো একটা ওষুধ আমার জন্য, কিন্তু দরকারি। কখনো কখনো জীবন তোমাকে ইটপাটকেল মারবে, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়ো না। আমি নিশ্চিত, যে জিনিসটা আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সেটা হচ্ছে, আমি যে কাজটি করছিলাম, সেটাকে আমি অনেক ভালোবাসতাম। তোমাকে অবশ্যই তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পেতে হবে, ঠিক যেভাবে তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজে বের করো। তোমার জীবনের একটা বিরাট অংশজুড়ে থাকবে তোমার কাজ, তাই জীবন নিয়ে সত্যিকারের সন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে এমন কাজ করা, যে কাজ সম্পর্কে তোমার ধারণা, এটা একটা অসাধারণ কাজ। আর কোনো কাজ তখনই অসাধারণ মনে হবে, যখন তুমি তোমার কাজটিকে ভালোবাসবে। যদি এখনো তোমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে না পাও, তাহলে খুঁজতে থাকো। অন্য কোথাও স্থায়ী হয়ে যেয়ো না। তোমার মনই তোমাকে বলে দেবে, যখন তুমি তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পাবে। যেকোনো ভালো সম্পর্কের মতোই, তোমার কাজটি যতই তুমি করতে থাকবে, সময় যাবে, ততই ভালো লাগবে। সুতরাং খুঁজতে থাকো, যতক্ষণ না ভালোবাসার কাজটি পাচ্ছ। অন্য কোনোখানে নিজেকে স্থায়ী করে ফেলো না।
আমার শেষ গল্পটির বিষয় মৃত্যু।
আমার বয়স যখন ১৭ ছিল, তখন আমি একটা উদ্ধৃতি পড়েছিলাম—‘তুুমি যদি প্রতিটি দিনকেই তোমার জীবনের শেষ দিন ভাব, তাহলে একদিন তুমি সত্যি সত্যিই সঠিক হবে।’ এ কথাটা আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল এবং সেই থেকে গত ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি—আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো, তাহলে আমি কি যা যা করতে যাচ্ছি, আজ তা-ই করতাম, নাকি অন্য কিছু করতাম? যখনই এ প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে কয়েক দিন ‘না’ হতো, আমি বুঝতাম, আমার কিছু একটা পরিবর্তন করতে হবে।
পৃথিবী ছেড়ে আমাকে একদিন চলে যেতে হবে, এ জিনিসটা মাথায় রাখার ব্যাপারটাই জীবনে আমাকে বড় বড় সব সিদ্ধান্ত নিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। কারণ, প্রায় সবকিছুই যেমন, সব অতি প্রত্যাশা, সব গর্ব, সব লাজলজ্জা আর ব্যর্থতার গ্লানি—মৃত্যুর মুখে হঠাত্ করে সব নেই হয়ে যায়, টিকে থাকে শুধু সেটাই, যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। তোমার কিছু হারানোর আছে—আমার জানা মতে, এ চিন্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে, সব সময় মনে রাখা যে একদিন তুমি মরে যাবে। তুমি খোলা বইয়ের মতো উন্মুক্ত হয়েই আছ। তাহলে কেন তুমি সেই পথে যাবে না, যে পথে তোমার মন যেতে বলছে তোমাকে?
প্রায় এক বছর আগের এক সকালে আমার ক্যানসার ধরা পড়ে। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে, এর থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই আমার। প্রায় নিশ্চিতভাবে অনারোগ্য এই ক্যানসারের কারণে তাঁরা আমার আয়ু বেঁধে দিলেন তিন থেকে ছয় মাস। উপদেশ দিলেন বাসায় ফিরে যেতে। যেটার সোজাসাপটা মানে দাঁড়ায়, বাসায় গিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। এমনভাবে জিনিসটাকে ম্যানেজ করো, যাতে পরিবারের সবার জন্য বিষয়টা যথাসম্ভব কম বেদনাদায়ক হয়।
সারা দিন পর সন্ধ্যায় আমার একটা বায়োপসি হলো। তাঁরা আমার গলার ভেতর দিয়ে একটা এন্ডোস্কোপ নামিয়ে দিয়ে পেটের ভেতর দিয়ে গিয়ে টিউমার থেকে সুঁই দিয়ে কিছু কোষ নিয়ে এলেন। আমাকে অজ্ঞান করে রেখেছিলেন, তাই কিছুই দেখিনি। কিন্তু আমার স্ত্রী পরে আমাকে বলেছিল, চিকিত্সকেরা যখন এন্ডোস্কোপি থেকে পাওয়া কোষগুলো মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে পরীক্ষা করা শুরু করলেন, তখন তাঁরা কাঁদতে শুরু করেছিলেন। কারণ, আমার ক্যানসার এখন যে অবস্থায় আছে, তা সার্জারির মাধ্যমে চিকিত্সা সম্ভব। আমার সেই সার্জারি হয়েছিল এবং দেখতেই পাচ্ছ, এখন আমি সুস্থ। 
কেউই মরতে চায় না। এমনকি যারা স্বর্গে যেতে চায়, তারাও সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরতে চায় না। কিন্তু মৃত্যুই আমাদের গন্তব্য। এখনো পর্যন্ত কেউ এটা থেকে বাঁচতে পারেনি। এমনই তো হওয়ার কথা। কারণ, মৃত্যুই সম্ভবত জীবনের অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। এটা জীবনের পরিবর্তনের এজেন্ট। মৃত্যু পুরোনোকে ঝেড়ে ফেলে ‘এসেছে নতুন শিশু’র জন্য জায়গা করে দেয়। এই মুহূর্তে তোমরা হচ্ছ নতুন, কিন্তু খুব বেশি দিন দূরে নয়, যেদিন তোমরা পুরোনো হয়ে যাবে এবং তোমাদের ঝেড়ে ফেলে দেওয়া হবে। আমার অতি নাটুকেপনার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটাই আসল সত্য।
তোমাদের সময় সীমিত। কাজেই কোনো মতবাদের ফাঁদে পড়ে, অর্থাত্ অন্য কারও চিন্তাভাবনার ফাঁদে পড়ে অন্য কারও জীবনযাপন করে নিজের সময় নষ্ট কোরো না। যাদের মতবাদে তুমি নিজের জীবন চালাতে চাচ্ছ, তারা কিন্তু অন্যের মতবাদে চলেনি, নিজের মতবাদেই চলেছে। তোমার নিজের ভেতরের কণ্ঠকে অন্যদের শেকলে শৃঙ্খলিত করো না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, নিজের মন আর ইনটুইশনের মাধ্যমে নিজেকে চালানোর সাহস রাখবে। ওরা যেভাবেই হোক, এরই মধ্যে জেনে ফেলেছে, তুমি আসলে কী হতে চাও। এ ছাড়া আর যা বাকি থাকে, সবই খুব গৌণ ব্যাপার।
আমি যখন তরুণ ছিলাম, তখন দি হোল আর্থ ক্যাটালগ নামের অসাধারণ একটা পত্রিকা প্রকাশিত হতো; যেটা কিনা ছিল আমাদের প্রজন্মের বাইবেল। এটা বের করতেন স্টুয়ার্ড ব্র্যান্ড নামের এক ভদ্রলোক। তিনি তাঁর কবিত্ব দিয়ে পত্রিকাটিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
স্টুয়ার্ট ও তাঁর টিম পত্রিকাটির অনেক সংখ্যা বের করেছিল। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমার বয়স যখন ঠিক তোমাদের বয়সের কাছাকাছি, তখন পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। বিদায়ী সেই সংখ্যার শেষ পাতায় ছিল একটা ভোরের ছবি। তার নিচে লেখা ছিল—ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো। এটা ছিল তাদের বিদায়কালের বার্তা। ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো। এবং আমি নিজেও সব সময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করেছি। আজ তোমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছেড়ে আরও বড়, নতুন একটা জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, আমি তোমাদেরও এটা মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি।
ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো।
তোমাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।